জাতীয় বীমা দিবসকে সামনে রেখে এইখাতের সমস্যা-সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতি নিয়ে বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যম ‘ইন্স্যুরেন্স ইনসাইডারবিডি’কে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নিটল ইন্স্যুরেন্সের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান একেএম মনিরুল হক।
সাক্ষাৎকারে খাতসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দিয়েছেন মি. হক। সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন নাসির আহমাদ রাসেল।
*এখন পর্যন্ত কত সংখ্যক গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠান নিটল ইন্স্যুরেন্সের বীমা সুরক্ষার আওতায় এসেছে। নিটল ইন্স্যুরেন্সের কী কী পরিকল্প রয়েছে?
একেএম মনিরুল হক: এখন পর্যন্ত আনুমানিক ১,৯৪,৯০০ এরও বেশি গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠান নিটল ইন্স্যুরেন্সের বীমা সুরক্ষার আওতায় এসেছে।নিটল ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশে প্রচলিত সকল নন-লাইফ পরিকল্প যেমন অগ্নি, মটর, নৌ (কার্গো/হাল), ইঞ্জিনিয়ারিং, এভিয়েশন ইত্যাদির পাশাপাশি গ্রাহকের চাহিদা অনুয়ায়ী অপ্রচলিত ক্যাটেল, শষ্য ও বিশেষায়িত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, সফটওয়্যার ইত্যাদি এবং নিটল এর উদ্ভাবিত বীমা পরিকল্প ‘নিরাপদ’ কপ্রিহেন্সিভ প্রাইভেট মটর বীমা করে থাকে।
সর্বশেষ নিরীক্ষিত হিসাবের আলোকে নিটল ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম আয়, দাবি নিষ্পত্তির হার, পরিশোধিত দাবির পরিমাণ কত?
একেএম মনিরুল হক: সর্বশেষ নিরীক্ষিত হিসাব ২০২২এর আলোকে নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রিমিয়াম আয় ৬১০,৮১৮,৮০৪ টাকা, দাবী নিষ্পত্তির হার ১২৩.৯৮% এবং পরিশোধিত দাবির পরিমাণ ১৫০,৯২৪,৩৫৩ টাকা।
*বর্তমানে কোম্পানির লাইফ ফান্ড, স্থায়ীসম্পদ এবং বিনিয়োগ কত?
একেএম মনিরুল হক: বর্তমানে নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর স্থায়ীসম্পদ ২৩৭,৬৪৯,৬৬১ টাকা এবং বিনিয়োগ ১,০৯৩,৫৯১,৮০৬ টাকা।
*কোম্পানির স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা কত?
একেএম মনিরুল হক: নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মোট ২৩৬ জন।
* প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে জিডিপিতে বাংলাদেশের বীমা খাতের অবদান এক শতাংশেরও কম। জিডিপিতে বীমার অবদান বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আরো কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
একেএম মনিরুল হক: জিডিপিতে বীমার অবদান বাড়াতে আমি মনে করি প্রথমেই প্রয়োজন গ্রাহকের আস্থা অর্জন, বীমা সম্পর্কে জানা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা, বীমা পরিকল্প সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের পদক্ষেপ এবং সর্বোপরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গ্রাহকের বীমা বাধ্যতামূলক করা ।
*আপনার দৃষ্টিতে দেশে বীমাখাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলো কী?
একেএম মনিরুল হক: বীমা খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা বা ধারনাই না থাকা, গ্রাহকের আস্থার সংকট, বীমাকে ঝুঁকি হিসেবে গ্রহণ না করা বা শুধু শুধু টাকা খরচ মনে করা ও বীমাকে সঞ্চয়ের সাথে তুলনা করা।
* নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন?
একেএম মনিরুল হক: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষে গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবাসিক ভবন, কৃষক, শ্রমিক, নারী, খামারী, সরকারী কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য বীমাসহ ১০ ধরনের বীমা পলিসির রূপরেখা চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে। এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে বীমা খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
পাশাপাশি বীমা প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন এবং গ্রাহকের সুরক্ষার লক্ষ্যে বীমা সুরক্ষা গাইডলাইন জারি করেছে, যা বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে বলে আমি মনে করি।
এছাড়া প্রচলিত বাজার ব্যবস্থাপনার বাহিরে অল্টারনেটিভ মার্কেট যেমন, কর্পোরেট এজেন্ট, ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুকরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করি এই উদ্যোগ বীমা ব্যবসার বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
* বীমা খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
একেএম মনিরুল হক: আমাদের বীমা শিল্প নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থাকায় এ শিল্পের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। জনসংখ্যার তুলনায় বীমার পেনিট্রেশন রেটও আশানুরূপ নয়। বর্তমানে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করছে। বীমা খাত উন্নয়নে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন সকল ষ্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সকল সময় নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে সকল গৃহিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে।
*বীমা খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ইমেজ সংকট। বীমাশিল্পে এই ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিটল ইন্স্যুরেন্সের কি ধরনের উদ্যোগ রয়েছে?
একেএম মনিরুল হক: বীমাশিল্পে এই ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিটল ইন্স্যুরেন্স সারা বছর নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে যেমন সকল মাধ্যমে বীমা সম্পর্কে প্রচার, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ, সর্বোত্তম গ্রাহক সেবা ও দ্রুততম সময়ে বীমা দাবী পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন। আমাদের কোম্পানির স্লোগানই হলো- গ্রাহকের নিরাপত্তাই আমাদের দায়িত্ব।
*বীমায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফেরাতে খাতকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। নিটল ইন্স্যুরেন্স এর সঙ্গে কতটা একাত্ম হতে পেরেছে?
একেএম মনিরুল হক: দেখুন আমাদের প্রতিষ্ঠান শুরুতেই স্মার্ট চিন্তার ধারক ও বাহক! তাই ২০০০ সালে আমরা যখন কাজ শুরু করেছি তখন থেকেই আমরা ডিজিটালি এগুনোর চেষ্টা করেছি! আর এই বিষয়টির উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছি! তাই শুরুতে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানকে কম্পিউটারাইজড করেছি! এখন আমাদের পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল সিস্টেমে চলে! আমাদের প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজেশনের একটি এক্সাম্পল অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে!
বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের বীমা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই। সূচনালগ্ন থেকেই নিটল ইন্স্যুরেন্স বীমা সফটওয়্যার এর মাধ্যমে কাজ করছে। আমাদের প্রধান কার্যালয়ের সকল বিভাগ ও সকল শাখা অফিস সমন্বিত ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংযুক্ত যা সহজেই সকল কাজ সম্পাদন করে । এছাড়া অনলাইনভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে বীমা পরিকল্প পরিষেবা, বীমা দাবী ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকের প্রিমিয়াম জমাকরণ করা হয়। যা নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সে আমরাই প্রথম চালু করি। আমাদের রয়েছে আপডেটেড ওয়েবসাইট, যার মাধ্যমে যে কোন গ্রাহক বা ষ্টেকহোল্ডার তার প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত জানতে পারেন। কোম্পানির রয়েছে নিজস্ব ইমেইল সার্ভার, যার মাধ্যমে নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে যোগাযোগ পরিষেবা প্রদান করে । এছাড়া সকল ডিজিটাল মাধ্যম যেমন ফেইজবুক, ইউটিউব ইত্যাদির মাধ্যমে রয়েছে আমাদের সরব উপস্থিতি ।
আর দেখুন যদি আমরা একা একা এই ডিজিটালাইজেশনে এগিয়ে যাই তাহলে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যঘাত ঘটবে! তাই বীমাখাতের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি বলব একযোগে সবাইকে সিস্টেমের আওতায় আসতে হবে! তবেই এর সাফল্য আমরা দেখতে পাব নচেৎ নয়!
* বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে দেশের বীমাখাতকে কিভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব বলে মনে করেন।
একেএম মনিরুল হক: দেখুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে ডিজিটাল থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ রূপান্তরে কাজ করে যাচ্ছে।
আগামী ৪১’ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আর সেই বাংলাদেশ হবে স্মার্ট বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে চলে যাবে দেশ!
আর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ দেশের ব্যাংক-বীমা খাতের ভূমিকা ও করণীয় বিশাল! কেননা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশনে ব্যাংক ও বীমার বিশাল ভূমিকা আছে! ব্যাংকেকে যেমন বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপর ফাইন্যান্স করতে হবে তেমনি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীমা পরিকল্প তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে! গোটা জাতিকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনতে হবে! কৃষির উপর নির্ভরশীল এই অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে কৃষি বীমার উপর জোর দিতে হবে ব্যাপক! আর ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশনারী হতে হলে প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসা-বাণিজ্যকে বীমার আওতায় আনতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। এমনকি সড়ক পথ, নৌপথ, রেলপথ, নদীপথ, আকাশপথে যানবাহন চালনাকে বীমার আওতায় বাধ্যতামূলক করতে হবে! উন্নত বিশ্বের মতো প্রত্যেকে বীমার বিষয়টি যেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে আগাতে হবে।
একটি দেশের বীমাখাত যতো শক্তিশালী সে দেশের অর্থনীতি ততো শক্তিশালী –এটা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তাই তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বীমাখাতের উন্নয়নে সংস্কারে আর সুশাসনে হাত দেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বীমাখাতের অবদান রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীমা পেশার আড়ালে স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজ করে গেছেন। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুই প্রথম বীমাখাতের সংস্কারে হাত দেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার বীমাখাতের উন্নয়নে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বীমাখাতের উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমান সরকার বীমা আইন পাস করেছে, বীমাখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করেছে। এছাড়াও বীমাখাতের উন্নয়নে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বঙ্গবন্ধু বীমাখাতের সাথে যেভাবে জড়িত, অর্থনীতির আর কোন খাতের সাথে এতো বেশি সম্পৃক্ততা তাঁর নেই বা ছিল না। তিনি বীমা পেশার মাধ্যমে তার সংগ্রামী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। তাই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বীমাখাতের বিশেষ অবদান রয়েছে। বঙ্গবন্ধু প্রথম উপলব্ধি করেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে বীমার উন্নয়ন করতে হবে। তাই তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জীবন বীমা করপোরেশন ও সাধারণ বীমা করপোরেশন নামে সরকারি ২টি প্রতিষ্ঠান করেন।
যে ঐতিহাসিক মাসে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। সেই মাসের ১ম দিনটি আমরা বীমা দিবস হিসেবে পেয়েছি। এটা আমাদের বীমাখাতের সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য গর্বের। কেননা এই দিনে তিনি রাজনীতির পাশাপাশি বীমা শিল্পে পেশাজীবনে জড়িত হয়েছিলেন! সুতরাং সংশ্লিষ্টরা বীমাখাতের সুশাসনের জন্য এই বিশাল ইমোশন বা সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগুতে পারে সহজেই!
সম্প্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বীমা ব্যবসার বিভিন্ন অনিয়ম দূর করার নিমিত্তে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা খুবই প্রশংসনীয়! আমি এবং আমার প্রতিষ্ঠান সবসময়ই সকল ধরনের সরকারি নির্দেশনার সাথে ছিলাম, আছি আর থাকব!
* অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ‘সবার জন্য বীমা’কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?
একেএম মনিরুল হক: অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বীমার একটা বিশাল ভূমিকা আছে যা আজ উন্নত বিশ্বে প্রমাণিত। অর্থনৈতিক সুফল সমাজের সকল স্তরে পৌঁছাতে হবে বিশেষ করে যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা বরাবর উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত থাকে অথচ যারা এই উন্নয়নের চাবিকাঠি বা নিয়ামক। যেমন, আমাদের কৃষক। তাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা, ফসলহানী বীমা, গবাদিপশু বীমা, ফিশারিজ ও পোলট্রি বীমা করা অত্যাবশ্যক। তবে এ ব্যাপারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অনুসরণে সরকারকে বীমার বিভিন্ন স্তরে (বীমা খরিদ ও ক্ষতিতে) বীমা কোম্পানির সাথে অংশগ্রহণমলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
*মোটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে? কেন মোটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করেন?
একেএম মনিরুল হক: ইতিমধ্যেই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। আশাকরি অতি দ্রুত সময়ে বিষয়টি আইনি কাঠামোর আলোকে চলে আসবে।
থার্ড পার্টি বীমাকে নিষিদ্ধ আর কম্প্রেহেন্সিভ বীমাকে ঐচ্ছিক করাতে গাড়ী ব্যবহারকারীরা বীমা বিমুখ হয়ে পড়েছে। তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা না থাকলে মোটরযান বা মোটরযানের মালিকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী কোনো মামলা দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে একদিকে বীমা গ্রহিতারা বঞ্চিত হচ্ছে ক্ষতিপূরণ থেকে অন্যদিকে বীমা কোম্পানীগুলো বঞ্চিত হচ্ছে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে। যে আয় থেকে সরকার হারাচ্ছে তার বিপুল রাজস্ব (ভ্যাট, ষ্ট্যাম্প ও ট্যাক্স)। বীমা শিল্পের উপর নির্ভরতা যাচ্ছে কমে, বেড়ে যাচ্ছে অনীহ। যার প্রভাব সরাসরি বীমা শিল্পের উপর পড়ছে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সকল সভ্য সমাজে বীমা ছাড়া রাস্তায় মটরগাড়ী চালানো যায় না। সুতরাং আমাদের এই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে, যদি নিজেদের সভ্য সমাজের অংশ মনে করি।
*ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর মাধ্যমে বীমা পরিকল্প বাজারজাতকরণের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর ফলে বীমার প্রতি যেমন গ্রাহকের আস্থা বাড়বে, তেমনি যেসব গ্রাহকের কাছে বীমা কোম্পানিগুলো এখনো পৌঁছাতে পারেনি; ব্যাংকাসুরেন্স তাদেরকে সেখানে পৌঁছে দেবে। আপনি কীভাবে দেখছেন?
একেএম মনিরুল হক: আমি মনে করি ব্যাংকাস্যুরেন্স একটি যুগান্তরকারী পদক্ষেপ। বীমা কোম্পানির পাশাপাশি একটি বিরাট সংখক ব্যাংক গ্রাহকের কাছে সহজেই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বীমা পরিকল্প জানানো ও পৌঁছানো যাবে এবং একটি আস্থার সর্ম্পক তৈরী হবে। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য একটি ইউনিফর্ম কাঠামো তৈরী করা অতি আবশ্যক বলে আমি মনে করি।
*২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার(এসডিজি)অন্যতম অভিষ্ট। দেশে এখনো স্বাস্থ্যসেবা পেতে একজন নাগরিককে ৬৯ থেকে ৭৪ ভাগ নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বীমা খাতের কি ধরনের কার্যক্রম রয়েছে এবং আরো কি কার্যক্রম নেয়া উচিৎ বলে মনে করেন?
একেএম মনিরুল হক: আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আকস্মিক অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে উদ্ভুত চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশম খায়। স্বাস্থ্য বীমা এইক্ষেত্রে বিরাট ভূমিক পালন করে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত স্বাস্থ্য বীমা যেমন, গ্রুপ বীমা, হসপিটাল কভারেজ বীমা, মেডিক্লেইম, পার্সোনাল এক্সিডেন্ট পলিসি, বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা ইত্যাদি রয়েছে। তথাপি বিরাট সংখক জনগণর চেতনতা ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকারিভাবে যদি সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে প্রচলন করে, তবে বিরাট সংখক নাগরিক এর সুফল পাবে। যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করবে।
*পহেলা মার্চ জাতীয় বীমা দিবস। এই দিবসকে ঘিরে আপনার প্রত্যাশা এবং অঙ্গীকারের কথা জানতে চাই। বীমা দিবসে গ্রাহকদের জন্য আপনার বার্তা কী?
একেএম মনিরুল হক: এবারের বীমা দিবসের প্রতিপাদ্য করবো বীমা গড়বো দেশ, স্মার্ট হবে বাংলাদেশ । এই প্রতিপাদ্য সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে সকল জায়গায় স্মার্ট হতে হবে। নিজের স্বাস্থ্য ও সম্পদের সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়ার জন্য বীমা গ্রাহকরা নিজ থেকে আরো সচেতন হবেন, এটাই আমার প্রত্যাশা।
বীমা শিল্প যে আস্থা সংকট এ ভুগছে, তা থেকে এই শিল্পকে বের করে আনা এবং অর্থনীতিতে বীমা শিল্পের অবদান বৃদ্ধি করাই হবে আমাদের প্রত্যাশা এবং অঙ্গীকার।
পরিশেষে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, ৬ দফা বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের একটি অন্যতম মাইলফলক। আর এই ৬ দফা বঙ্গবন্ধু রচনা করেন তৎকালীন বীমা প্রতিষ্ঠান আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিসে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীকার আন্দোলনে আপাময় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করেছেন এই বীমা পেশার আড়ালে। এইজন্য আমরা সবাই বীমা পরিবারের একজন হিসেবে সরকারের কাছে আবেদন করছি বীমা শিল্পকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য।
জনাব, এ কে এম মনিরুল হক ইন্স্যুরেন্স ইনসাইডার বিডি ডটকমকে মূল্যবান সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।











