Berlin
সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
Breaking
ব্র্যাক ব্যাংকের ইস্যু করা দেশের প্রথম সোশ্যাল বন্ডে মেটলাইফের ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ জীবন বীমা কর্পোরেশনের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক সোনালী লাইফের ২০২৬ সালের প্রথম মাসিক ব্যবসা উন্নয়ন সভা নন-লাইফ বীমায় শূন্য কমিশন বাস্তবায়নে মনিটরিং কমিটি গঠন মেটলাইফের ‘এজেন্সি অব দ্য ইয়ার ২০২৫’ পেল সুমন এজেন্সি নন-লাইফ বীমায় কমিশনের নামে আর্থিক সুবিধা নিষিদ্ধ, আইন ভাঙলে শাস্তি: আইডিআরএ তরুণদের নতুন ভরসা বীমা পেশা সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দ্বাদশ বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত শক্তিশালী লাইফ ফান্ডে মজবুত ভিত্তি গার্ডিয়ান লাইফের বেঙ্গল ইসলামি লাইফ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে কর্পোরেট চুক্তি
অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইডিআরএতে আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরীর চিঠি

নন-লাইফ বীমা শিল্পে সংস্কার ও উদ্ভাবনের আহ্বান

  • প্রকাশের সময় : ২ মাস ১ সপ্তাহ ১৬ ঘন্টা ৭ মি. আগে, ০৭:০৯:২৪ পি.এম, বৃহস্পতি, ৬ নভে ২০২৫
  • 388
ক্যাপশন আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী মিন্টু
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নন-লাইফ বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলার জন্য কয়েক দফা সুপারিশ করেছেন বাংলাদেশ জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী। সম্প্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে তিনি নন-লাইফ বীমা খাতের কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিমালা আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

চিঠিতে তিনি বলেন, বীমা শিল্পের পরিধি বাড়াতে হলে নন-লাইফ বীমা খাতের নিয়ম ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী করা জরুরি। এতে বীমা খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বহির্বিশ্বে নন-ট্যারিফ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ব্যবসা অর্জন করতে হয়। সেখানে ঝুঁকি অবলিখনের আগে প্রত্যক্ষ ঝুঁকি পরিদর্শন (Pre-inspection of risk) একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। কিন্তু দেশে ট্যারিফ মার্কেটে সাধারণত ডেস্ক থেকে ঝুঁকি অবলিখন (Desk Underwriting) করা হয়, যা বীমা কোম্পানির জন্য ক্ষতির সময় বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে।

আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী নন-লাইফ বীমা খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে এবং নতুন খাতগুলো বীমার আওতায় আনতে আইডিআরএর নীতিগত সহায়তা কামনা করেন। তিনি মনে করেন, নন-লাইফ বীমা খাতে বাধ্যতামূলক বীমা ক্ষেত্র বাড়ানো হলে প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সরকারি ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি প্রস্তাব করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা কর্পোরেশন শতভাগ সরকারি ব্যবসা আন্ডাররাইট করলে খাতটি আরও শক্তিশালী হবে। বর্তমানে সরকারি ব্যবসার অর্ধেক বেসরকারি কোম্পানির মধ্যে বণ্টিত হয়, যা তিনি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

প্রিমিয়াম হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি বাংলাদেশে নন-ট্যারিফ মার্কেট প্রবর্তনের সুপারিশ করেন। তার মতে, “বাংলাদেশে ট্যারিফ মার্কেটে প্রিমিয়ামের হার বিশ্ববাজারের তুলনায় বেশি, ফলে অতিরিক্ত কমিশন প্রদানের প্রবণতা দেখা যায়। নন-ট্যারিফ মার্কেট চালু হলে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বীমা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

পুনঃবীমা নীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ৫০ শতাংশ পুনঃবীমা বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সঙ্গে করতে হয়, যা ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা যেতে পারে। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ স্থানীয় বা বিদেশি পুনঃবীমাকারীর সঙ্গে চুক্তির সুযোগ দিলে কোম্পানিগুলো বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। এই পুনঃবীমা অনুপাত ৭০ শতাংশের বেশি করা যাবে না, সে বিষয়ে আইডিআরএ বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “নতুন পণ্য উদ্ভাবনে কোম্পানিগুলোর উৎসাহ দিতে পরীক্ষামূলক সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। সফল হলে পরে আইডিআরএ’র অনুমোদন নেওয়া যাবে।”

বীমা দাবী নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রিমিয়াম পরিশোধে নমনীয়তা আনা এবং দেশি-বিদেশি পুনঃবীমা ব্রোকারদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে আইডিআরএকে অনুরোধ জানান তিনি।

৩৯ বছরের বীমা পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী বলেন, “বীমা খাতের কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে বাংলাদেশে নন-লাইফ বীমা শিল্প আরও গতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করতে পারবে।”

বাংলাদেশের বীমা খাত এখনো ট্যারিফনির্ভর ও আংশিক নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ বিশ্বব্যাপী বীমা খাতের সাফল্যের মূলমন্ত্র হলো উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা। সময় এসেছে বাংলাদেশের বীমা খাতকেও সেই আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করার।

উন্মুক্ত (Free and Open) বাজার কেবল প্রিমিয়াম রেটের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে না—এটি সেবার মান, জনবল দক্ষতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বীমা খাতের জন্য এটি হতে পারে এক ‘গেম চেঞ্জার’ নীতি পরিবর্তন।

উন্নত ও উন্নয়নশীল অধিকাংশ দেশেই বীমা খাতে International Best Practice অনুসরণ করা হয়।

সেখানে ঝুঁকি অবলিখনের (Underwriting) আগে প্রত্যক্ষ ঝুঁকি পরিদর্শন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে Desk Underwriting প্রক্রিয়া প্রচলিত, যেখানে প্রস্তাবপত্রে বর্ণিত তথ্যের ওপরই সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে তথ্যের ঘাটতি বা ইচ্ছাকৃত ভুল বর্ণনার কারণে দাবি নিষ্পত্তির সময় কোম্পানিগুলো জটিলতায় পড়ে।

নন-ট্যারিফ মার্কেটে গেলে এসব অনিয়ম বা সীমাবদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্রাস পাবে, কারণ প্রতিযোগিতার চাপেই কোম্পানিগুলো সেবার মান বাড়াতে বাধ্য হবে।

ট্যারিফ মার্কেটের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের ট্যারিফ মার্কেটে প্রিমিয়াম হার তুলনামূলক বেশি। এই উচ্চ রেটের কারণে বীমা গ্রাহকরা কমিশন নিয়ে নিজেদের খরচ কমায় । আইডিআরএ’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী,

বর্তমানে নন-লাইফ বীমা খাতে প্রায় ৩,১৩৫ জন এজেন্ট কাজ করছেন। ২০২৩ সালে বীমা খাতের এজেন্ট নিবন্ধন ফি বাবদ সরকারের আয় হয়েছে ১.২৯ মিলিয়ন টাকা। বছরে প্রতি এজেন্টের নবায়ন ফি বাবদ ১২০০ টাকা সরকারি কোষাগারে দেয়া হয়। ২০২৩ সালে এ খাত থেকে সংগৃহীত গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৪,৭৫২.৩৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১৪.২৫ শতাংশ এজেন্ট কমিশন দিলে মোট কমিশন আসে ৬৭৭,১৬,০০০০০ কোটি টাকা। এই কমিশন থেকে ৫ শতাংশ ট্যাক্স কর্তন বাবদ এনবিআরএ’র রেভিনিউ হয় ৩৩,৮৫,০০, ০০০ কোটি টাকা।

সুতরাং এজেন্ট না থাকলে সরকার এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে । অনেক এজেন্টই বেতন নেন না তারা কমিশনের ভিত্তিতেই কাজ করেন । এজেন্ট কমিশন বাদ দেয়া হলে এই বিপুলসংখ্যক জনবলকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে হবে, যা কোম্পানিগুলোর উপর আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

নন-ট্যারিফ মার্কেট: প্রতিযোগিতার নতুন দিগন্ত

নন-ট্যারিফ বাজারে ব্যবসা কোনো প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র অধিকার নয়। উন্নত গ্রাহক সেবা, দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং স্বচ্ছ প্রিমিয়াম কাঠামোই এখানে সাফল্যের চাবিকাঠি।

উন্মুক্ত বাজারে গেলে প্রিমিয়াম রেট বাজার-নির্ধারিত হবে—যেখানে সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মুখ্য ভূমিকা রাখবে। এতে বীমা গ্রাহকরা স্বল্প প্রিমিয়ামে আন্তর্জাতিক মানের বীমা সেবা গ্রহণ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।

পুনঃবীমা নীতিতে সংস্কার প্রয়োজন

বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী, নন-লাইফ কোম্পানিগুলোকে ৫০ শতাংশ পুনঃবীমা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (SBC) সঙ্গে করতে হয়।

এই বিধান পরিবর্তন করে ৩০ শতাংশ দেশীয় ও ৭০ শতাংশ বিদেশি বা বিকল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুনঃবীমার সুযোগ দিলে বাজারে বৈচিত্র্য ও দক্ষতা বাড়বে।

 

বিদেশি পুনঃবীমার সুযোগ বাড়লে ঝুঁকি বণ্টন (Risk Diversification) এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।

 

বাধ্যতামূলক বীমা ও নতুন পণ্যের সুযোগ

বাংলাদেশে বীমা সেবার পরিধি এখনো সীমিত। বাধ্যতামূলক বীমার আওতায় নতুন খাত চিহ্নিত করা হলে যেমন বাজার বিস্তৃত হবে, তেমনি জনগণের আর্থিক সুরক্ষাও বাড়বে।

একই সঙ্গে নতুন পণ্য উদ্ভাবনে পরীক্ষামূলক সময়সীমা (Trial Period) নির্ধারণ, দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রিমিয়াম পরিশোধের সময়সীমা এক মাস পর্যন্ত শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে।

সলভেন্সি মার্জিন ও আর্থিক সুশাসন

খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকের স্বার্থরক্ষায় Solvency Margin চালু করা জরুরি।

এটি বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড।

এই ব্যবস্থা চালু হলে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক দায় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং অতিরিক্ত কমিশন প্রদানে বিরত থাকবে।

বাংলাদেশের বীমা খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে। প্রচলিত ট্যারিফ ও নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থায় যেতে পারলে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।