নন–লাইফ বীমায় ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকার বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে-এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন খাত–সংশ্লিষ্টরা। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কমিশন বন্ধ এবং ব্যক্তি এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিতের উদ্যোগ নিয়েছে। সব নন–লাইফ কোম্পানিকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে লাইসেন্স স্থগিতের প্রস্তাবনা পাঠাতে বলা হয়েছে, এরপরই কমিশন শূন্য করার আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
খাতের অভিজ্ঞদের মতে, অবৈধ কমিশন ও বাজার বিকৃতি রোধে সংস্কারের প্রস্তাব থাকলেও, কমিশন পুরোপুরি শূন্য করে দেওয়ার ফলে এজেন্টনির্ভর ব্যবসা সংগ্রহ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে নন–লাইফ খাতে ৩ হাজারের বেশি ব্যক্তি এজেন্ট সক্রিয়; কমিশননির্ভর এই কাঠামো ভেঙে দেওয়া হলে গ্রাহকের খরচ, কোম্পানির অপারেশন এবং বাজারের প্রতিযোগিতার ধরন—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংম্লিষ্টরা বলছেন, নন লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন বাতিল হলে সরকার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাবে। কর্মসংস্থান হারাবে বহু এজেন্ট।
আইডিআরএ’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নন-লাইফ বীমা খাতে ৩ হাজার ১৩৫ জন ব্যক্তি এজেন্ট কাজ করছেন। প্রতি এজেন্টের নবায়ন ফি বাবদ ১২০০ টাকা সরকারি কোষাগারে দেয়া হয়। সে হিসেবে ২০২৩ সালে বীমা খাতের এজেন্ট নিবন্ধন ফি বাবদ সরকারের আয় হয়েছে ১.২৯ মিলিয়ন টাকা।
২০২৩ সালে এ খাত থেকে সংগৃহীত গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৪,৭৫২.৩৫ কোটি টাকা। বিদ্যমান নিয়মে এ খাতে ১৪.২৫ শতাংশ এজেন্ট কমিশন দেয়া হলে মোট কমিশন আসে ৬৭৭,১৬,০০০০০ কোটি টাকা। এই কমিশন থেকে ৫ শতাংশ ট্যাক্স কর্তন বাবদ এনবিআরএ’র রেভিনিউ হয় ৩৩,৮৫,০০, ০০০ কোটি টাকা। খাত সংম্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন বাতিল হলে সরকার প্রতিবছর এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে । অনেক এজেন্টই বেতন নেন না তারা কমিশনের ভিত্তিতেই কাজ করেন । এজেন্ট কমিশন বাদ দেয়া হলে এই বিপুলসংখ্যক জনবলকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে হবে, যা কোম্পানিগুলোর উপর আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
বিমা খাতের অভিজ্ঞদের মতে, কমিশন শূন্য করা হলে নন–লাইফ বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কারণ-এজেন্টই এখন নন লাইফ খাতের প্রধান মার্কেটিং চ্যানেল।কমিশন বন্ধ হলে ব্যবসা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে। প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যেতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালের ১ মার্চ থেকে হঠাৎ করে নন-লাইফ বীমা কোম্পানির এজেন্ট কমিশন প্রদান স্থগিত করে সার্কুলার জারি করেছিল আইডিআরএ। পরবর্তীতে বীমা এজেন্ট নিয়োগ, নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রবিধানমালা-২০২১ জারি হওয়ার কারণে কমিশন বন্ধের সার্কুলারের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। সেই ‘বীমা এজেন্ট নিয়োগ, নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রবিধানমালা-২০২১’ কার্যকর থাকা অবস্থাতেই পুনরায় এজেন্ট কমিশন বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে কমিশন নিয়ে নীতিগত অস্থিরতা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
নন লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন দিয়ে ব্যবসা সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বন্ধে বিআইএ’র আবেদনের প্রেক্ষিতে কমিশন শূন্য করার এই নীতিগত সিদ্ধান্তে এসেছে আইডিআরএ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাত সংম্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছে- বিআইএ কমিশন বাতিলের প্রস্তাব দিলেও, এই পদক্ষেপে খাতটিতে আদৌ কমিশনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে-তারা কী তা বিশ্বাস করেন? এই প্রতিযোগিতা তখনই বন্ধ হবে যখন যৌক্তিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে।
বর্তমানে এজেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া ১৯৩৮ সাল থেকে প্রচলিত
আছে এবং লাইফ, নন-লাইফ সকল বীমা ব্যবসায় এজেন্ট প্রথা স্বীকৃত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাত সংম্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন বীমা কর্মকর্তা বলেন, এজেন্ট
প্রথার কারণে বীমা গ্রাহকরা কিছুটা হলেও উপকৃত হয়। কারণ- ট্যারিফ মার্কেটের জন্য বাংলাদেশের প্রিমিয়ামের হার অনেক বেশী। অনেক গ্রাহক এজেন্ট কমিশনের মাধ্যমে তাদের পণ্যের ব্যয় সমন্বয় করে থাকে ।
এজেন্ট কমিশন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর প্রায় ৩৩.০০ কোটি টাকা
ট্যাক্স বাবদ পেয়ে থাকে । সুতরাং এজেন্ট কমিশন বাতিলের আগে কর্তৃপক্ষের উচিৎ হবে- নন ট্যারিফ মার্কেটের প্রচলন করা । সলভেন্সি মার্জিন কার্যকর করা।











