-
- ২৬ কোম্পানির সাথে বৈঠক
- বীমা কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান বিএসইসি’র
- লাইফ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শর্তে আরও শিথিলতা চান মুখ্য নির্বাহীরা
- কম ইপিএসেও তালিকাভুক্তির দাবি
- বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে কোম্পানি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার আহ্বান নিয়ন্ত্রক সংস্থার
- দুর্বল কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে অনাগ্রহ আইডিআরএ’র
নাসির আহমাদ রাসেল: বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল ও কারসাজিমুক্ত পুঁজিবাজার নিশ্চিত করতে
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শর্ত আরো সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এছাড়া কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে কম ইপিএসেও তালিকাভুক্তির দাবি জানানো হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে।
পুঁজিবাজারে চলমান মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে দেশের ২৬টি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সাথে বিএসইসির ডাকা বৈঠকে তারা এ আহ্বান জানান। বুধবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে কমিশনের মাল্টিপারপাস হলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৭টি এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন ১৯টি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা বিএসইসির এই বৈঠকে অংশ নেন ।
বৈঠকে কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয় বিএসইসির পক্ষ থেকে।
এর জবাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে নানা শঙ্কার কথা তুলে ধরেন মুখ্য নির্বাহীরা। তারা বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আমাদের আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাব কিনা তা নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। এ সময় পুঁজিবাজারে কারসাজি হবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে এমন নিশ্চয়তা চান বীমা কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পরিষদের অনাগ্রহের কথা জানিয়ে বৈঠকে কয়েকজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারের অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাদের পর্ষদ গ্রাহকের আমানত অস্থির বাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না।
তারা বলেন, পুঁজিবাজারে ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোর ২০ শতাংশ বিনিয়োগের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেখানে আমরা বিনিয়োগ করতে চাই। তবে বিনিয়োগের অর্থ যে ফেরত পাব তার কোন নিশ্চয়তা নেই, এজন্য আমরা স্থিতিশীল পুঁজিবাজার প্রত্যাশা করছি।
পুঁজিবাজারে চলমান মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে বীমা কোম্পানিগুলোকে নিয়ে একই ছাদের নিচে এই বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বৈঠকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যানকে থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে আইডিআরএর পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক হারুন অর রশিদ বৈঠকে অংশ নেন। তিনি বলেন, আমরা চাই পুঁজিবাজারে এমন কোম্পানিগুলো না যাক যারা ভালো করার পরিবর্তে খারাপ করবে। পুঁজিবাজারে যাওয়ার অর্থ হলো একটি কোম্পানির প্রশাসনকে আরো শক্তিশালী করা। আমরা চাই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত হোক, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হোক। কোম্পানিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং সক্ষমতা যাচাই করেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমতি দেয়া উচিত বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে।
বৈঠকে বিএসইসি কমিশনার শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে এখানে ডাকা হয়েছে তাদেরকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে বেশ কিছু সুযোগ, সুবিধা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে তাদের ছাড় দেওয়া হইছে। যাতে তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কিভাবে বিনিয়োগ করলে তা সঠিক হবে আপনারা চাইলে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আমরা উদ্যোগ নেব। তাহলে আপনাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে।
বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, বিশ্বের সকল দেশের বীমা কোম্পানিগুলো অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। একই সাথে তারা পুঁজিবাজারেও বড় ধরনের অবদান রেখে থাকে। আমরা এখানে যে ২৬ টি কোম্পানিকে ডেকেছি তারাও যাতে পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এজন্য তাদেরকে বেশ কিছু সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো অন্যতম। আমাদের দেশেও ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো যদি মূল ভিত্তি দেখে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে তবে অন্য যেকোনো বিনিয়োগের তুলনায় এখানে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। এ সময় আগামী এক সপ্তাহ কোম্পানিগুলোকে সাধ্যমত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এলআইসি (বাংলাদেশ), মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স ও সিকদার ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর মধ্যে বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে- ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স।
তথ্য মতে, পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার কম থাকা এমন ২৬টি বিমা কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ইকুইটির ২০ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করার শর্তে ছাড় প্রদান করে বিএসইসি। কিন্তু কোম্পানিগুলো ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি ও ইকুইটির ২০ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ- এ দু’টির কোনোটিই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায় এসব বিমা কোম্পানিকে তালিকাভুক্তি ও ইকুইটির ২০ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে বৈঠকের উদ্যোগ নেয় বিএসইসি।
এর আগে ২৬টি বিমা কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য ছাড় দিয়ে ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল বিএসইসি। প্রজ্ঞাপনে, বিমা কোম্পানিগুলো ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির আইপিওর মাধ্যমে ন্যূনতম ১৫ কোটি টাকার তহবিল উত্তোলন করতে পারবে। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে তাদের ইকুইটির ন্যূনতম ২০ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হবে।
পরবর্তীতে চলতি বছরের গত ২৯ মার্চ এক চিঠিতে আইডিআরএকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানায় বিএসইসি। চিঠিতে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর জন্য এরই মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলোকে যে ছাড় প্রদান করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে আইডিআরএ’কে অনুরোধ জানানো হয়।
বিএসইসির মতে, বিমা কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আসার আগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে, যা বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে অবদান রাখবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে পুঁজিবাজারে শেয়ারের সরবরাহও বাড়বে।####











